কমলগঞ্জে মাদকের বিস্তার রোধে সামাজিক সচেতনতা জরুরি: আবুল কালাম

খবরের ডাক ডেস্ক
প্রকাশিত জানুয়ারি ৮, ২০২৩
কমলগঞ্জে মাদকের বিস্তার রোধে সামাজিক সচেতনতা জরুরি: আবুল কালাম

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: নাহিদ আহমেদ: সীমান্তবর্তী উপজেলা কমলগঞ্জে মাদকের সহজলভ্যতা এবং তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাদক ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি এবং তরুণদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার জন্য কাজ করছেন স্থানীয় তরুণ ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী আবুল কালাম। কমলগঞ্জের মাদক পরিস্থিতি, এর সামাজিক প্রভাব এবং প্রতিরোধের উপায় নিয়ে তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

প্রশ্ন: কমলগঞ্জের বর্তমান মাদক পরিস্থিতি আপনি কীভাবে দেখছেন?

আবুল কালাম: কমলগঞ্জ ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি একটি এলাকা। এই ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে কিছু চক্র সীমান্তপথে মাদক এনে এলাকায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক এখন তুলনামূলকভাবে সহজে পাওয়া যাচ্ছে। আগে গোপনে মাদক বিক্রি হতো, কিন্তু বর্তমানে অনেক জায়গায় এটি প্রকাশ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন: তরুণদের ওপর এর কী প্রভাব পড়ছে?

আবুল কালাম: সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের তরুণ সমাজ। অল্প বয়সে অনেকে কৌতূহল বা খারাপ সঙ্গের কারণে মাদক গ্রহণ শুরু করছে। পরে তারা ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকের টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে কেউ কেউ চুরি, ছিনতাই এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করছে। এতে শুধু একজন ব্যক্তি নয়, পুরো পরিবার ও সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রশ্ন: আপনি মাদকবিরোধী কার্যক্রমে কীভাবে যুক্ত হলেন?

আবুল কালাম: কলেজে পড়ার সময় থেকেই আমি এলাকার সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলতাম। মাদকের কারণে পরিচিত কয়েকজন তরুণের জীবন নষ্ট হতে দেখে বিষয়টি আমাকে খুব নাড়া দেয়। এরপর বন্ধু ও এলাকার তরুণদের নিয়ে ছোট পরিসরে আলোচনা, সভা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করি। আমরা মানুষকে মাদকের ক্ষতি বোঝানোর চেষ্টা করি এবং তরুণদের খেলাধুলা, নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও অন্যান্য ইতিবাচক কাজে যুক্ত হতে উৎসাহিত করি।

প্রশ্ন: এসব কার্যক্রমে তরুণদের সাড়া কেমন?

আবুল কালাম: অনেক তরুণ ইতিবাচকভাবে সাড়া দিয়েছে। তাদের অনেকেই মাদক থেকে দূরে থাকতে চায়, কিন্তু খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সুস্থ বিনোদনের পর্যাপ্ত সুযোগ পায় না। তাদের জন্য নিয়মিত খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সামাজিক কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা গেলে অনেককে মাদকের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

প্রশ্ন: এলাকায় মাদক ব্যবসা বন্ধ করা যাচ্ছে না কেন?

আবুল কালাম: আমার পর্যবেক্ষণে, সাধারণ মাদক বিক্রেতাদের পেছনে আরও প্রভাবশালী লোকজন রয়েছে। স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে অভিযোগ রয়েছে যে কিছু মাদক ব্যবসায়ী জুয়েল-রিপুল গ্রুপের রাজনৈতিক আশ্রয় ও সমর্থন পায়। এই প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষ তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পায়। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে হুমকি, হয়রানি বা অন্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হতে পারে—এমন ভয় মানুষের মধ্যে আছে।

প্রশ্ন: আপনি কি জুয়েল-রিপুল গ্রুপকে সরাসরি মাদক ব্যবসার জন্য দায়ী করছেন?

আবুল কালাম: আমি যা নিজে দেখেছি, মানুষের কাছ থেকে শুনেছি এবং এলাকায় লক্ষ্য করেছি, তার ভিত্তিতে কথা বলছি। এলাকার অনেক মানুষের অভিযোগ, মাদক কারবারিদের ওপর এই গ্রুপের রাজনৈতিক প্রভাব ও সুরক্ষা রয়েছে। এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোক, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত তা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করা।

প্রশ্ন: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

আবুল কালাম: পুলিশ মাঝেমধ্যে ছোট মাদক বিক্রেতা বা মাদক বহনকারী ব্যক্তিকে আটক করে। কিন্তু মাদক সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত মূল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কম দেখা যায়। শুধু ছোট বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদকের মূল সরবরাহকারী এবং তাদের আশ্রয়দাতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।

প্রশ্ন: এসব বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আপনি কোনো চাপ বা হুমকি অনুভব করেছেন কি?

আবুল কালাম: মাদকের বিরুদ্ধে কথা না বলার জন্য আমাকে পরোক্ষভাবে সতর্ক করা হয়েছে। পরিচিত কয়েকজন বলেছেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কথা বললে আমার ব্যবসা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তারপরও আমি মনে করি, ভয়ের কারণে সবাই চুপ থাকলে আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎ আরও বিপদের মধ্যে পড়বে।

প্রশ্ন: আপনার কি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে?

আবুল কালাম: না। আমি কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে এই কাজ করি না এবং দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই। একজন ব্যবসায়ী ও এলাকার বাসিন্দা হিসেবে সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলি। তরুণদের সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই আমার উদ্দেশ্য।

প্রশ্ন: মাদক সমস্যা মোকাবিলায় এখন কী করা প্রয়োজন?

আবুল কালাম: প্রথমত, মাদকের মূল সরবরাহকারী এবং তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। পরিবার, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসন—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

প্রশ্ন: কমলগঞ্জের মানুষের প্রতি আপনার বার্তা কী?

আবুল কালাম: মাদক শুধু একজন মানুষের নয়, পুরো সমাজের সমস্যা। সন্তানদের আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে পরিবারের সদস্যদের দ্রুত খোঁজ নেওয়া উচিত। তরুণদের অবহেলা না করে তাদের সময় দিতে হবে এবং ভালো কাজে উৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কথা বললে এবং প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করলে কমলগঞ্জকে মাদকের ক্ষতি থেকে রক্ষা করা সম্ভব।