ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও ভারত ভাগের মাত্র সাত মাস পর ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় পা রাখেন পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। পূর্ব পাকিস্তানে সেটিই ছিল তার প্রথম এবং শেষ সফর। যক্ষ্মাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন জিন্নাহ। ঢাকায় আসার ছয় মাসের মধ্যেই তিনি মারা যান।
দশ দিনের ওই সফরে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ঢাকাসহ চট্টগ্রামে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এ সময় তিনি একাধিক স্থানে বক্তব্যও দেন। এর মধ্যে ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্য বিশেষভাবে আলোচিত। এসব অনুষ্ঠানে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়েন জিন্নাহ।
জিন্নাহর সেই ভাষণের বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো-
ভদ্র মহোদয় ও মহোদয়াগণ আপনাদের উপাচার্য মহাশয় যখন আমাকে এসে অনুরোধ করলেন সমাবর্তন একটা বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। আমি তাকে স্পষ্ট বলে দিলাম আমার নানা ব্যস্ততার কারণে সমাবর্তনের জন্য একটা আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা প্রস্তুত করা হয়তো সম্ভব হবে না; যা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহান বিষয়াদি যেমন শিল্প ইতিহাস দর্শন বিজ্ঞান আইন প্রকৃতির সঙ্গে মানসম্মত হয়। যাইহোক- আমি অবশ্য প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, সমাবর্তন উপলক্ষে ছাত্রদের সামনে দুটো কথা বলব এবং এখন যে কথাগুলো বলব তা এই প্রতিজ্ঞা পূরণই বলা যায়। প্রথমেই উপাচার্য মহাশয়কে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করব বিভিন্ন গাল ভরা বিশেষণে আমাকে বিশেষায়িত করার জন্য।
জনাব উপাচার্য। আমি এখন যা করছি কিংবা যতটা করতে সক্ষম হয়েছি মোটামুটি সবই ছিল আমার দায়িত্ব পালন। একজন মুসলমান হিসেবে সততা এবং নিঃস্বার্থতার সঙ্গে দেশের মানুষের সেবা করাটা দায়িত্ব হিসেবে বর্তায়। আপনাদেরকে যখন আমি কথাগুলো বলছি, তা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নয় বরং এমন একজন বন্ধু হিসেবে বলছি, যে সার্বক্ষণিক আপনাদের মমতায় বেঁধে রাখে। অনেকেই আজকে তাদের ডিপ্লোমা এবং ডিগ্রি অর্জন করেছেন। আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। আপনারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিজেদের যোগ্য প্রমাণ করার জন্য জয় মাল্য ছিনিয়ে নিয়েছেন।
বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত পরিসরে যেখানে আপনারা প্রবেশ করতে যাচ্ছেন সেখানেও আপনাদের সফলতা কামনা করছি। অনেকেই আপনাদের শিক্ষা জীবনের শেষ প্রান্তে এবং জীবনের চরম চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। আপনারা ভাগ্যবান যে একান্ত নিজেদের একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যেতে পারছেন যা আপনাদের পূর্বপুরুষরা পারেননি। পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্মের কারণে যে যুগান্তকারী পরিবর্তনগুলো সূচিত হয়েছে তা আপনাদের এবং পরবর্তী ছাত্রদের বুঝতে পারাটা অত্যন্ত জরুরি। পরাধীনতার শিকল আমরা ভেঙেছি এখন আমরা মুক্ত মানুষ। আমাদের দেশ আমাদের একান্ত নিজেদের।
আমাদের সরকার একান্ত নিজেদের। জনগণের জন্য জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য কাজ করে যাচ্ছি। যাই হোক, স্বাধীনতা মানে কিন্তু লাইসেন্স পাওয়া নয়, এর মানে এই নয় যে তোমরা যা ইচ্ছা তাই করবে। রাষ্ট্রের কে কি মনে করল সেসব না ভেবে যেমন ভালো লাগে তেমন আচরণ করবে। আপনাদের উপর অনেক দায়িত্ব। বলতে গেলে অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি। আমাদের একতাবদ্ধ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জাতি হিসেবে কাজ করতে হবে। স্বাধীনতা অর্জনের সময় যে সামরিক শক্তির প্রয়োজন ছিল তার চেয়ে এখন বেশি দরকার উন্নয়নমূলক শক্তির জন্য।
স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সামরিক শক্তির প্রয়োগের চেয়ে কঠিন হচ্ছে তাকে গড়ে তোলাটা। জেলে যাওয়া কিংবা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা সরকার পরিচালনার চেয়ে সহজতর। বরঞ্চ যেসব বিপদ আমরা কাটিয়ে উঠেছি এবং যেসব কতিপয় ঝামেলা সামনে আসছে সেসব সম্পর্কে আপনাদের দুটি কথা বলি। পাকিস্তানের জন্ম ঠেকাতে না পারার অতৃপ্ত বাসনা মেটানোর জন্য শত্রুরা এখন নজর দিয়েছে আমাদের দুর্বল এবং ধ্বংস করার পথ খুঁজতে। এ কারণেই সরকার ক্ষমতায় আসতে না আসতেই পাঞ্জাব এবং দিল্লির ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হলো। হাজার হাজার পুরুষ, নারী এবং শিশুকে জবাই করা হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ ঘর ছাড়া হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই এমন ৫০ লাখ মানুষ পাঞ্জাবে এসে হাজির হয়েছে।