স্যারের মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখার সময় সম্ভবত শব্দ পেয়ে তার স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে চলে আসেন। তারা চিৎকার শুরু করেন। তখন মুগ্ধ স্যারের স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন। আর সিদ্ধার্থ স্যারের মেয়ের গলা চেপে ধরেন। একপর্যায়ে স্যারের স্ত্রীর গলায় থাকা গামছা দিয়েই মেয়েটির গলায় প্যাঁচ দেওয়া হয়। পরে পাশের কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি নিয়ে মেয়েটির গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেওয়া হয়। এভাবে মা ও মেয়েকেও হত্যা করা হয়।
এরপর বাড়িতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কি না, সেই আশঙ্কা থেকে তারা নিচতলায় যান। সেখানে একটি পুরোনো প্লাস পান। সেটি দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন, যাতে কোনো ক্যামেরা থাকলেও সেটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে তারা আবার ছাদে যান। মা ও মেয়ের মরদেহ ছাদের গেটের ভেতরে সিঁড়ির দিকে রেখে দেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, দেবুদের বাড়ির ছাদ থেকে যেন মরদেহ দেখা না যায়।
এরপর তারা স্যারের ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে গিয়ে দেখেন, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে গেছে। শিশুটি সিদ্ধার্থকে চিনতে পারে এবং বলে, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’
পুলিশ কমিশনার বলেন, “এর আগে আমরা শিশুটি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল বলে যে তথ্য পেয়েছিলাম, তখন সেই তথ্যের ভিত্তিতেই বিষয়টি জানিয়েছিলাম। কিন্তু আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তাঁরা বলেছেন, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলে এবং তার নাম ধরে ডাকে।”
শিশুটি চিৎকার করে অন্যদের জানিয়ে দিতে পারে—এই আশঙ্কায় তারা তাকে হত্যা করেন। জবানবন্দি অনুযায়ী, কাপড় দিয়ে শিশুটির গলায় প্যাঁচ দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়। এরপর তাঁরা দুজনই অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তারা গোসল করেন। গোসলের পর তাঁদের কাছে থাকা আরেকটি ইয়াবা সেবন করেন।
এরপর মুগ্ধের মাথায় বাড়িটিকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর পরিকল্পনা আসে। তারা ঘরের ড্রয়ার খুলে জিনিসপত্র এলোমেলো করতে থাকেন। মুগ্ধ বিভিন্ন অলংকার এনে দেন। সিদ্ধার্থ সেগুলো প্লাস্টিকের বাক্স ও কাপড়ের প্যাকেটে রাখেন। বাড়ি থেকে তাঁরা ১৫ হাজার টাকা নেন।
জুমার নামাজের সময় বাইরে মানুষের চলাচল কমে গেলে তারা স্যারের বাড়ির ছাদ থেকে দেবুদের বাড়ির ছাদে যান। এরপর দেয়াল টপকে বাইরে বের হয়ে যান। মুগ্ধ ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যান। আর স্বর্ণালংকারের ব্যাগ নিয়ে সিদ্ধার্থ একটি গলিতে যান। পরে কাউকে বুঝতে না দিয়ে পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পেছনে মাটির নিচে স্বর্ণালংকারগুলো রেখে দেন। বিজয় কাকা ও পূর্ণিমা কাকি এসব বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
এরপর সিদ্ধার্থ বাড়িতে গিয়ে আবার গোসল করেন। পরে মুগ্ধের কাছে গিয়ে তার ভাগের ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেন। ওই টাকা দিয়ে বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন। পরদিন সিদ্ধার্থ স্বাভাবিকভাবে দোকানে কাজে যান। অন্যদিকে মুগ্ধ বাড়িতেই ছিলেন। পরে পুলিশ মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করে।
মুগ্ধ দাসের আদালতের জবানবন্দিতেও ঘটনার প্রায় একই বর্ণনা পাওয়া গেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২১ তারিখ রাত আনুমানিক ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে ইয়াবা সেবনের জন্য তাঁরা দেবুদের বাড়ির সীমানাপ্রাচীর টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন। দেবুদের বাড়ির নিচতলার নির্মাণকাজ তখনও শেষ হয়নি। সিঁড়িতে কোনো দরজা ছিল না। ফলে সেখানে সহজেই যাতায়াত করা সম্ভব ছিল। ছাদটিও খোলা ছিল।
মুগ্ধের বক্তব্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থের পরামর্শেই তারা গণপতি স্যারের ছাদে যান। সিদ্ধার্থ তাকে বলেছিলেন, এর আগেও তিনি ওই ছাদে এক-দুই দিন ইয়াবা সেবন করেছেন।
গণপতি স্যারের ছাদে পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে তারা ইয়াবা সেবন করেন। মুগ্ধের হিসাবে সেদিন মোট নয়টি ইয়াবা সেবন করা হয়। এরপর ভোরের আলো ফুটে যায় এবং গণপতি স্যার তাদের দেখে ফেলেন। এরপর একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। সেই চিৎকারের বিষয়ে একজন স্থানীয় নারী সাক্ষ্য দিয়েছেন বলেও তদন্তে পাওয়া গেছে।
ওই নারী ঘটনার বিষয়ে পুলিশকে তথ্য দেওয়ার পর তার স্বামী তাকে মারধর করেছেন বলেও জানা গেছে। পুলিশ কমিশনার বলেন, এ ধরনের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কোনো ঘটনা শুনে থাকলে বা দেখে থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দেওয়া উচিত।